Home / Cricket / ক্রিকেট মাঠের দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী অমর ১১ জন ক্রিকেটার

ক্রিকেট মাঠের দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণকারী অমর ১১ জন ক্রিকেটার

মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জন্মিলে মরিতে হইবে- এ কথা কারো অজানা নয়। কিন্তু মৃত্যু যদি হয় ক্রিকেট মাঠে খেলারত অবস্থায়, তাহলে তা সত্যিই মেনে নেওয়া কষ্টকর। ক্রিকেট জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত যারা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে মারা গিয়েছেন তাদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা। তাদের পরপারে শান্তি কামনা করেই শুরু করছি আজকের লেখা। চলুন আজ জেনে নিই তাদের সম্পর্কে, যারা প্রাণ হারিয়েছেন ক্রিকেট মাঠে, কিংবা মাঠে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ফিল হিউজ (অস্ট্রেলিয়া, ২০১৪)

সর্বশেষ এই ক্রিকেট মাঠের দুর্ঘটনায় মারা যান যিনি, তিনি আমাদের সবার পরিচিত ফিল হিউজ। পুরো ক্রিকেট বিশ্ব কেঁদেছিলো তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে। খেলা হচ্ছিলো সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্যে।  সে ম্যাচে সিন এবটের একটি বাউন্স বলকে তিনি হুক করতে গিয়ে মাথার পেছনে আঘাত প্রাপ্ত হন।

পরে মাঠের মধ্যেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি পরবর্তীতে সাবএরাকনয়েড হেমারেজে পরে তিনি কোমায় চলে যান। সেন্ট ভিন্সেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৭ নভেম্বর তাকে মৃত ঘোষণা করে। তিনি অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের হয়ে ২৬টি টেস্ট ও ২৫টি ওডিআই ম্যাচ খেলেন।

তাকে ধরা হচ্ছিলো ভবিষ্যত অস্ট্রেলিয়ার এক অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবে। তার মৃত্যুতে মাইকেল ক্লার্ক সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে মুষড়ে কেদেছিলেন তা আমাদের ক্রিকেট প্রেমীদের আজীবন মনে থাকবে।
ড্যারেন ( দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৩)
২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ডার ক্রিকেট বোর্ড প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে ড্যারেন ওল্ড সেলবোর্নিয়ান্সের হয়ে ফোরে হারে ইউনিভার্সিটির বিপক্ষে ব্যাট করছিলেন।

তখন ব্যাটিং এ পুল শট খেলতে গিয়ে একটি বল তার মাথায় আঘাত হানে। সাথে সাথেই তাকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তিনি পরর্তীতে মারা যান।

জুলফিকার ভাট্টি (পাকিস্তান, ২০১৩)
২০১২ সালে পাকিস্তানের সিন্ধ এলাকার সুক্কুরে এক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ব্যাটিং চলাকালে পুল শট খেলতে গিয়ে একটি বল তার বুকে আঘাত হানে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে সাথেসাথেই সেখানকার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
রিচার্ড বিউমাউন্ট (ইংল্যান্ড, ২০১২)

২০১২ সালে পেডমোর ক্রিকেট ক্লাবের পক্ষে খেলছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে তিনি পেস অ্যাটাকে ৫ উইকেট লাভ করেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি এক মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন।

সাথে সাথেই তাকে এয়ার এম্বুলেন্সে করে বারমিংহামের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে নিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছাবার পরপরই তিনি মারা যান।

ওয়াসিম রাজা (পাকিস্তান, ২০০৬)
ওয়াসিম রাজা পাকিস্তান পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত ক্রিকেটার ছিলেন। তিনি জাতীয় দলের হয়ে ৫৭টি টেস্ট ও ৫৪টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন। তিনি ছিলেন মূলত একজন অলরাউন্ডার।

ক্রিকেট থেকে অবসরের পর তিনি ২০০২ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত আম্পায়ারিং করেন। ২০০৬ সালে বাকিংহামশায়ারের পক্ষে ৫০ ওভারের ওয়ানডে ম্যাচ খেলা চলা অবস্থায় তার হার্ট অ্যাটাক হয়। সেদিনই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রমন লাম্বা (ভারত, ১৯৯৮)

রমন লাম্বা ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত ব্যাটসম্যান। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় তখন খেলা চলছিলো মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মধ্যে। লাম্বা তখন আবাহনীর হয়ে ফিল্ডিং করছিলেন শর্টলেগে। সাইফুল্লাহ খানের স্পিন বলে তখন ব্যাটসম্যান মেহরাব হোসেন অপি সজোরে হাঁকান লেগের দিকে। বলটি তখন লাম্বার মাথায় আঘাত হেনে আরেকজন ফিল্ডারের হাতে এসে ক্যাচে পরিণত হয়।

প্রথমিকভাবে তিনি সামলে উঠেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ৩ দিন পর তিনি হাসপাতালে মারা যান। কপিল দেবের ভাষ্যমতে, ‘তার এ মৃত্যু ফিল্ডারদের তাদের প্রয়োজনীয় সঞ্জামাদি পরে মাঠে খেলতে শিক্ষায় দেবে।’

ইয়ান ফলে (ইংল্যান্ড, ১৯৯৩)
ইয়ান ফলে ছিলেন একজন ইংরেজ ক্রিকেটার। তিনি ১৯৯২ সালে হোয়াইটহাভেন ও ওয়ারকিংটনের মধ্যকার খেলায় হোয়াইটহাভেনের হয়ে ব্যাটিং এর সময় চোখে আঘাত পান। এর ফলে তার চোখের কর্ণিয়ার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর সেখানে ডাক্তাররা তাকে অচেতন করে অপারেশন শুরু করেন।

কিন্তু অপারেশনের সময়ই তার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার এ ঘটনায় নিজেদের অবহেলার দোষ স্বীকার করে।

উইলফ্রেড স্ল্যাক (ইংল্যান্ড,১৯৮৯)
স্ল্যাক ছিলেন একজন ইংলিশ বাঁহাতি ওপেনার। তিনি ইংল্যান্ড ও মিডেলসেক্সের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। গাম্বিয়ার বাঞ্জুলে এক ম্যাচে হঠাৎ করে চোখেমুখে অন্ধকার হয়ে মাঠের মধ্যেই পড়ে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিকতায় ভুগছিলেন। তখনকার ডাক্তাররা তার এই রোগ সনাক্ত করতে পারেনি। তার এই মৃত্যুর পর থেকে মিডেলসেক্সের কর্তৃপক্ষ খেলোয়াড়দের ইসিজি টেস্টের ব্যবস্থা চালু করে।
আবদুল আজিজ (পাকিস্তান, ১৯৫৮)

খেলা চলছিলো করাচি ও পাকিস্তান কম্বাইন্ড সার্ভিসের মধ্যে। সেটি ছিলো কায়েদে আজম ট্রফির ফাইনাল ম্যাচ। ক্রিজে ছিলেন ৮টি ফার্স্টক্লাস ক্রিকেট খেলা উইকেটরক্ষক কাম ওপেনিং ব্যাটসম্যান আজিজ। চলছিলো ১ম ইনিংসের খেলা। বোলার দিলদ্বার আওয়ানের স্লোও অফ ব্রেক বলটি সোজা বুকে গিয়ে আছড়ে পড়লো। কিছুটা ব্যাথা পেলেন। পরের বলের জন্য তখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন।

আবদুল আজিজ; Source: ProudPak.pk

কিন্তু হঠাৎ করেই মাঠের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন তিনি। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মাঝপথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সে খেলার ২য় ইনিংসে তার সম্বন্ধে লিখা হয়েছিলো অনুপস্থিত কিন্তু ফুটনোটে বলা হয়েছিলো মৃত।

এন্ডি ডুক্যাট (ইংল্যান্ড, ১৯৪২)
তিনি ছিলেন একাধারে একজন ইংলিশ ক্রিকেটার ও ফুটবলার। বিশ্বে যে ক’জন মানুষ একই সাথে দুটি খেলায় জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিনি ৪২৯টি ম্যাচ খেলে ২৩ হাজারের অধিক রান করেন। ক্রিকেট থেকে অবসরের পর, এই কিংবদন্তি ১৯৩১ সালে এল্টন কলেজের কোচ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ৫ বছর ধরে। ১৯৪২ সালে তখন লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সারে হোম গার্ড ও সাসেক্স হোমগার্ডের মধ্যকার ম্যাচ চলছিলো।

এন্ডি ডুক্যাট; Source: rvcj.com

লাঞ্চের পরপরই আবার শুরু হওয়া সেই ম্যাচে তিনি হঠাৎ করেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তার সম্মানে সেই ম্যাচটি বাতিল করা হয়। লর্ডসে ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মৃত্যুবরণ করা একমাত্র এই ক্রিকেটারের বয়স হয়েছিলো ৫৬ বছর। তার এ খেলার কাভারেজে লিখা ছিলো নট আউট বাট ডেড!
জর্জ সামার্স (ইংল্যান্ড, ১৮৭০)

বলছি ১৮৭০ সালে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের কথা। তখন খেলা হচ্ছিলো নটিংহ্যামশায়ার ও এমসিসির মধ্যে। ব্যাটিং প্রান্তে তখন ৩২টি ফার্স্ট ক্লাস খেলা ব্যাটসম্যান জর্জ সামার্স। এদিকে বোলিং প্রান্তে আগুন ঝরাচ্ছেন জন প্ল্যাটস। মরণফাঁদ সেই লর্ডসের পিচে তখন বোলাররা পাচ্ছিলো সুবিধা। পাঠকদের বলে রাখা উচিত যে, বর্তমানের মতো তখন ব্যাটসম্যানদের মাথায় হেলমেট পড়বার নিয়ম ছিলো না। এমনি পরিস্থিতিতে বোলার জন প্ল্যাটস করলেন এক বাউন্স বল। ব্যাটসম্যান সামার্স বুঝে উঠবার আগেই বল আঘাত হানে তার মাথায়। তিনি তখনই ক্রিজে পড়ে যান। এরপর তুলা দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।

জর্জ সামার্স; Source: CricketCountry.com

প্রাথমিকভাবে অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি প্রায় সেরে উঠেছেন এজন্য তিনি আর হাসপাতালে যাননি। পরবর্তীতে তিনি ট্রেনে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পরিস্থিতি অবনতি ঘটে বাড়িতে আসার পর। আঘাতের রেশ ধরে ৪ দিন পর নটিংহ্যামশায়ারে তার পিতৃগৃহে মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনার পরে প্ল্যাট বাকি জীবনে কখনো আর দ্রুত গতির বোলিং করেননি। এরপর থেকে তিনি মিডিয়াম পেসার হয়ে বোলিং করতেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা এ ব্যাটসম্যানকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে ক্রিকেট অনুরাগীরা।

ক্রিকেট যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবেন এই মহান খেলোয়াড়রা। তাদের প্রতি রইলো অসীম শ্রদ্ধা ও শান্তিকামনা।

Check Also

ভারতের পর এশিয়া কাপের সূচি-জটিলতায় বাংলাদেশ!

আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্দা উঠতে যাচ্ছে এশিয়া কাপের। দুবাইয়ে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে এবারের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *