Breaking News
Home / Cricket / অভিষেকে ৩ আর বিদায়ী ম্যাচে ৮ উইকেট, আর ক্যারিয়ার জুড়ে অসংখ্য রেকর্ড!! শুভ জন্মদিন লেজেন্ড

অভিষেকে ৩ আর বিদায়ী ম্যাচে ৮ উইকেট, আর ক্যারিয়ার জুড়ে অসংখ্য রেকর্ড!! শুভ জন্মদিন লেজেন্ড

বলছিলাম মুত্তায়া মুরলিধরনের কথা। হুট করে গল টেষ্টের আগে ঘোষণা দিলেন শেষ বারের মত মাঠে নামছেন তিনি। ৮শর ঘরে পৌছাতে তখনো বাকী ৮ উইকেট!প্রতিপক্ষ ইন্ডিয়া। এমনিতেই ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানদের স্পিনে ভাল খেলার সুখ্যাতি আছে। মনের ভেতর একটা অজানা ভয় জেগে উঠল।
পারবেন তো মুরলিধরন?

গল টেষ্টের ১ম ইনিংসে ৫ উইকেট আর ২য় ইনিংসে ৩ উইকেট নিয়ে প্রথম এবং একমাত্র ক্রিকেটার হিসাবে ৮০০ উইকেটের ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করেন মুরলিধরন। রাজকীয় ভাবেই বিদায় নেন এই বাইশ গজের ব্যাটসম্যানদের স্পিনের মায়াবী জালের এই শিকারী।

ক্যারিয়ার জুড়ে তাকে সবচেয়ে বেশি সঙ্গ দিয়েছেন চামিন্ডা ভাস।দুই জন মিলে ১৬৩টি ইনিংস এক সাথে বল করেছেন। এই জুটির উইকেট সংখ্যা ৮৭৯ টি। টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যান দের খাবি খাওয়াতেন ভাস। এমনও হয়েছে মুরালিধরন আক্রমণে আসার আগেই প্যাভিলনে ফিরে গেছে প্রতিপক্ষের টপ অর্ডার। যার কারণে টেষ্টে মুত্তিয়ার টপ অর্ডার(১-৩নম্বর পজিশন) ব্যাটসম্যানের উইকেট তুলনামূলক কম। তার মোট উইকেটের মাত্র ২৫.৩ শতাংশ অর্থাৎ ২০২টি উইকেট টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের উইকেট ছিল।যমদূত ছিলেন মিডেল অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের। ৪২.৩ শতাংশ (৩৩৮টি) উইকেট শিকার করেছেন ৪-৭ নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যানদের আউট করে। টেল থেকে প্রাপ্ত বাকী ২৬০ উইকেট।দলের প্রধান অস্ত্র ছিলেন মুরালিধরনই। দলীয় উইকেটের শিকারের ৪২.৩ শতাংশ উইকেট মুরালিধরন একাই নিজের ঝুলিতে তুলেছেন।

১৩৩ টেষ্টের ২৩০ ইনিংসে বল করেছেন ৪৪০৩৯ টি। ওভারের হিসাবে ৭৩৯৩. ৫ ওভার। মেডেইন ওভার ১৭৯২টি। শুধু অস্ট্রেলিয়া(৯৯টি মেডেইন) ছাড়া বাকী সব গুলো টোষ্ট প্লেয়িং নেশনের বিপক্ষে ১০০+ মেডেইন ওভার অছে। প্রতিটি টেষ্ট প্লেয়িং নেশনের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেওয়ার বিরল রেকর্ডটি তার দখলে। টেষ্টে ৬৭ বার ৫উইকেট শিকারের পাশাপাশি ২২টি ম্যাচে ১০ উইকেট শিকার করেছেন। এর মধ্যে টানা ৪ টেষ্টে ১০ উইকেট শিকারের বিরল রেকর্ডও আছে এই লিজেন্ডের। ইংল্যান্ড,ইন্ডিয়া আর সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে তার উইকেট সংখ্যা ১০০+।
বাকী দলগুলোর মধ্যে এক অস্ট্রেলিয়া ছাড়া সবগুলো দলের বিপক্ষেই ৮০+ উইকেট আছে।

দাপট বজায় রেখেছিলেন সীমিত ওভারের ম্যাচেও। খেলেছেন ৩৫০টি ওডিআই ম্যাচ। ৩৪১ ইনিংসে বল করেছেন ৩১১৫.১ ওভার। মেডেইন ১৯৮টি। ওভার প্রতি দিয়েছেন ৩.৯৩ রান।২৩.০৮ এভারেজে উইকেট শিকার ৫৩৪টি। ৪টি করে উইকেট নিয়েছেন ২৫ বার। ওডিআই ফরম্যাটে হোম কন্ডিশনে সবচেয়ে বিপদজনক ছিলেন তিনি। ঘরের মাটিতে ৩৮০ উইকেট তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এই লিজেন্ডের শুরুটা কিন্তু সহজে ছিল না। পার হতে হয়েছে বহু পাহাড়-পর্বত, গিরিখাদে মত বাধাঁ। বোলিং অ্যাকশন নিয়ে হয়েছে প্রচুর তর্ক বিতর্ক। মুরালিধরন বল করেই যাচ্ছে আর আম্পায়ারগণ নো বল ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।শুরুটা ১৯৯৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর মেলবোর্নে শুরু হওয়া মেলবোর্ন টেস্টে মুরালির ক্যারিয়ারটাকেই শঙ্কার মুখে ফেলে দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চাকিংয়ের অভিযোগ এনেছিলেন বিতর্কিত অস্ট্রেলীয় আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার।সেই বক্সিং ডে টেস্টের প্রথম দিনে হেয়ার ৭বার নো ডাকেন মুরালিধরনকে! সেই সময় খোদ স্যার ডন ব্র্যাডম্যান সমালোচনায় সরব হয়েছিলেন হেয়ারের আম্পায়ারিং নিয়ে। দুর্ভাগ্যবশত এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেক অস্ট্রেলীয় আম্পায়ার এমারসনের রোষানলে পরেন মুরালিধরন। মুরালিধনের প্রথম ওভারে ৩বার!২য় ওভারে ২বার এবং তৃতীয় ওভারে ২বার নো ডাকেন এই এমারসন।

নিন্দার ঝড় উঠে ক্রিকেট বিশ্বে । অনেক সাবেক তারকাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়…….ইচ্ছা করেই নো বল ডেকে মুরালিধরনকে শেষ করে দেওয়ার অপচেষ্টায় মত্ত হয়ে গেছেন অস্ট্রেলীয় আম্পায়াররা।
মুরালিধরনকে যেতে হয় পরীক্ষাগারে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগে হংকংয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবীন্দ্র গুনাতিল মুরালিধরনের বায়ো-মেকানিকস পরীক্ষা করেন এবং মুরালিধরনের বোলিং অ্যাকশনকে বৈধ ঘোষনা করেন। রবীন্দ্র গুনাতিলের রিপোর্টের ভিত্তিতে আইসিসি মুরালিধরনকে বোলিং চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। কিন্তু ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি একদিনের ম্যাচে সেই এমারসন আবার নো ডাকেন মুরালিধরনকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসে খেলা শেষ না করে।
আবার পরীক্ষাগারে যেতে হয় মুরালিধরনকে।

সাফল্যের সাথে সেবারও উতরে যান পরীক্ষায়। আইসিসি কোনো অবস্থাতেই মুরালিধরনের অ্যাকশনকে পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়নি। ২০০৪ সালে মুরালিধরনের দুসরাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড। আরও একবার পরীক্ষাগারে মুরালিধরন।

ততদিনে একটা রিউমার প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে গেছিল। অনেকেই বলতে শুরু করেন শেন ওয়ার্নকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতেই মুরালিধরনকে বলীতে চড়াতে চেয়েছিল অস্ট্রলিয়ানরা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মুরালিধরনের পারফমেন্স কখনোই স্বাভাবিক ছিল না। অস্ট্রেলীয় মিডিয়া, আম্পায়ার, প্রতিপক্ষ এমন কি গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের কটু বাক্য ছুটে আসত মুরাধরনের দিকে। এমন কি অস্ট্রেলিয়ার প্রধান মন্ত্রী জন হাওয়ার্ডসও তাকে #চাকার ট্যাগ দিয়েছিলেন। যার কারণে ২০০৪ অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে নিজের নামও প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় মুরাধন নিজেও প্রশ্ন তুলেছিলেন শেন ওয়ার্নের দ্রুত গতির ডেলিভারি গুলোর উপর। সেবার নড়ে চরে বসে আইসিসি। সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার অরবিন্দ ডি সিলভা, অ্যাঙ্গাস ফ্রেজার, মাইকেল হোল্ডিং, টনি লুইস, টিম মে এবং আইসিসির ডেভ রিচার্ডসনকে নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করে আইসিসি। আইসিসির বায়োমেকানিক্যাল বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এবারও অ্যাকশনের বৈধতা পায় মুরালিধন। চাকিং-সংক্রান্ত সেই প্রতিবেদনে বলা হয়……

“”মুরালির জন্মগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই স্বাভাবিকের চেয়ে তাঁর হাতের কনুই বল ডেলিভারির সময় বেশি সোজা হয়ে যায়। এতেই বিভ্রান্তি ঘটে।””

আর আইসিসি পরবর্তী সময়ের কথা চিন্তা করে বোলারদের কনুই বাঁকানোর সীমা ৫ ডিগ্রি থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডিগ্রি করে দেয়। এভাবেই সব বিতর্কর অবসান হয়। জয়ী হয়েছেন মুরলিধরন। শেষ ম্যাচ পর্যন্ত বোলিং করে গেছেন তার নিজস্ব অ্যাকশনেই।

ভয়ঙ্কর চাহনির এই বোলার।সব সময়ই ছিলেন শান্ত-ভদ্র।শুধু ক্রিকেট নিয়ে নয় মানবিকতায় জয় করেছেন সবার মন। ২০০৪ সালে সুনামি-আক্রান্ত এলাকায় ১০ ট্রাক ত্রাণ জরুরিভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে ত্রাণকাজ তদারকিও করেন বিশ্বকাপজয়ী এই ক্রিকেটার।

কেউ ইতিহাস জন্ম দেয়…. কেউ ইতিহাসকে জন্ম দেয়!

আজ ১৭ এপ্রিল।
১৯৭২ সালের আজকের এই দিনেই. আজীবন অ্যাকশন-কন্ট্রোভার্সির মধ্যে থাকা এই ইতিহাসের জন্মদাতা স্পিন বোলিং এর মহামানব,অপূর্ব শিল্পীর জন্ম হয়েছিল শ্রীলংকার ক্যান্ডিতে।
আজ এই লিজেন্ডের ৪৬তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মায়াবী বিষের সুনিপুন শিল্পী।
ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।

তথ্য:- cricinfo, Wikipedia, cricket360, নক্ষত্র।
লেখাঃ আসাদ মতিউর

Check Also

সুখবরঃ বিসিবির নতুন নিয়মে সুযোগ পাচ্ছেন তারা, তালিকার শীর্ষে আছেন আশরাফুল। ২য় শাহরিয়ার নাফিস। পড়ুন বিস্তারিত

ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বিপিএল। প্রতিবছরই বিপিএল শুরু …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: